সুন্দরবন উপকূলের কয়রার লবণাক্ত পানি আর ‘বাঘ বিধবাদের’ গল্প


রুদ্রবাংলা প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩১, ২০২৪, ১৭:০০ /
সুন্দরবন উপকূলের কয়রার লবণাক্ত পানি আর ‘বাঘ বিধবাদের’ গল্প

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সুন্দরবনে উপকূল খুলনার কয়রা, যেখানে বীজ বুনলে সোনার ফসল ফলত। সেখানে ছিল গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ। কিন্তু লবণ পানির চিংড়ি চাষ ও বার বার নদী ভাঙনের কারণে এখানকার মানুষ নব্বইয়ের দশক থেকে কৃষি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। ভূমিহীন হতে থাকেন প্রান্তিক কৃষক।

বেকার হয়ে পড়েন বর্গাচাষি ও কৃষিশ্রমিক। বিপদসংকুল সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে এলাকার মানুষের। কেউবা কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকেন। নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে জীবন বাঁচাতে জীবিকার তাগিদে বনে যান তারা।

কেউ যান মাছ ধরতে, কেউ কাঠ কাটতে, কেউবা মধু সংগ্রহে। এর মধ্যেই কখনো কখনো এসব জেলে, বাওয়াল ও মৌয়ালের ওপর হামলে পড়ে বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। খুব কম লোকই বাঘের কবল থেকে জীবিত ফিরে আসেন। আর যেসব বনজীবী মারা যান, সমাজ তাদের স্ত্রীদের নাম দিয়েছে ‘বাঘ বিধবা’।ক্রমেই সমগ্র উপকূলীয় এলাকা লবণাক্ত ভূমিতে পরিণত হয়। সুন্দরবনের প্রান্তসীমায় হাজার হাজার বনজীবীর বসবাস। সুন্দরবনকেন্দ্রীক উপজেলাগুলোর মধ্যে খুলনার কয়রা উল্লেখযোগ্য। এ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ জনগণ সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। মহেশ্বরীপুর, কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের মানুষজন সুন্দরবনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

পেশায় এরা সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালী, পোনা সংগ্রহকারী। এ সকল পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা যারা সুন্দরবনে যান। তারা অনেকেই বাঘ ও কুমিরের আক্রমণের শিকার হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)-এর এক জরিপে বলা হয়, ২০০১ সাল থেকে ২০২৩-এর জুলাই পর্যন্ত ২২ বছরে কয়রা উপজেলায় ১৩৩ জন বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন। এর মধ্যে আমাদী ইউনিয়নে ২২ জন, বাগলী ইউনিয়নে ১৭, মহারাজপুর ইউনিয়নে ২১, কয়রা সদর ইউনিয়নে ৩৮, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে ৪ ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ৩১ জন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। কারো লাশ পাওয়া যায়, কারো শুধু দেহের সামান্য অংশ। বাঘের আক্রমণে বেঁচে ফিরে দুজন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। দুজন মাথায় আঘাত নিয়ে কয়েক বছর পর মোটামুটি সুস্থ। এরই মধ্যে অনেকেই জীবন বাচাঁনোর তাগিদে আবারও সুন্দরবনে ছুটে চলেছেন।

সুন্দরবন এলাকায় নদীতে জাল টেনে চলেছেন মরিয়ম বিবি, মনিরা খাতুন, মোমেনা বেগমসহ কয়েকজন ‘বাঘ বিধবা’। কথা হয় তাদের সঙ্গে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন ও নদীভাঙন কবলিত এক উপকূলীয় জনপদ কয়রার বেদকাশি ইউনিয়ন। দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ের চারধারে নদী। এই দ্বীপ জনগোষ্ঠীকে সুন্দরবন, নদী এবং লবণাক্ত কৃষি জমির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। আইলা, সিডর দুর্গত ওই ইউনিয়নের জোড়জিং গ্রামের মোমেনা বেগমের ছেলে বিল্লাল হোসেন বলেন, প্রথমে বাপ সুন্দরবন করতো। ২০০১ সালে বাপ মারা যাওযার পর মা নদীতে জাল টেনে সংসার চালাতো। মায়ের বয়স হওয়াতে এখন সে নদীতে জাল টানে। তাদের পরিবারের সদস্য পাঁচজন। ময়না বেগম বলেন, লবণ পানির চিংড়িঘের না হলে আমি ‘বাঘ বিধবা’ হতাম না। আমার স্বামী দিনমজুরির কাজ করতো। স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল। এলাকার কৃষি জমিতে দৈনিক কাজ করতে পারতো। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কৃষি জমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। আমার স্বামী কাজ হারাতে থাকে। কোনো উপায় না পেয়ে সুন্দরবনে মধু কাটতে যায়। একদিন সকালে মধু কাটার সময় সে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়।

সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবন চালাচ্ছেন আরেক ‘বাঘ বিধবা’ জাহানারা। আইলা দুর্গত মহারাজপুর ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। পরিবারের সদস্য তিনজন। জাহানারা বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরির কাজ করতো। এলাকার চিংড়িঘের বাড়তে থাকায় স্বামীর কাজের অভাব দেখা দেয়। কোনো উপায় না পেয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরা ও মধু কাটতে যায়। ২০০৯ সালে একদিন সকালে মাছ ধরার সময় সে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন। অনেকে সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, এলাকার মানুষের বদ্ধমূল ধারণা, ‘অলক্ষ্মী’ নারীদের জন্যই তাদের স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এ ধারণা থেকেই ওইসব নারীদের ওপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। অনেকে স্বামী মারা যাওয়ার পর বাবার বাড়ি, নদীর চরে সরকারি খাস জায়গায় ও অন্যের জমিতে বসবাস করছেন। স্থায়ী বাসস্থান না থাকার কারণে সেবা প্রদানকারী সংগঠনের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের ছেলে-মেয়েরা শিক্ষাবঞ্চিত। দীর্ঘক্ষণ লোনা পানিতে থাকার ফলে চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। অর্থাভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন না। অনেকবার লবণ-পানি উত্তোলন বন্ধের তারিখ রেজুলেশনের মাধ্যমে নির্ধারণ হলেও কয়েক দফায় তারিখ পরিবর্তন হয়, কিন্তু লবন পানি উত্তোলন বন্ধ হয় না।