সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপকূলে লবণ পানি নারীকে করছে স্বামী হারা,বদলাতে হচ্ছে পেশা


রুদ্রবাংলা প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩০, ২০২৪, ১২:০৫ /
সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপকূলে লবণ পানি  নারীকে  করছে স্বামী হারা,বদলাতে হচ্ছে পেশা

খুলনা প্রতিনিধি :বাংলাদেশে দক্ষিণ অঞ্চল বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে সুন্দরবন উপকূল খুলনার কয়রা যেখানে বীজ বুনলে সোনার ফসল ফলত, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ছিল। কিন্তু লবণ পানির চিংড়ি চাষ ও বার বার নদী ভাঙ্গনের কারণে এখানকার মানুষ নব্বইয়ের দশকে কৃষি থেকে উৎখাত হতে থাকে, ভূমিহীন হয়ে যেতে থাকে প্রান্তিক কৃষক, বেকার হয়ে পড়ে বর্গা চাষি ও কৃষি শ্রমিক। বিপদসংকুল সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে এলাকার মানুষ।নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব হয়ে জীবন বাঁচাতে জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে যান তারা। কেউ যান মাছ ধরতে, কেউ যান বনের কাঠ কাটতে, কেউ বা মধু সংগ্রহ করতে।এর মধ্যেই কখনো কখনো এসব জেলে, বাওয়াল ও মৌয়ালের ওপরে হামলে পড়ে বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। খুব কম লোকই বাঘের কবল থেকে জীবিত ফিরে আসেন। আর যেসব বনজীবী মারা যান, সমাজ তাদের স্ত্রীদের নাম দিয়েছে ‘বাঘ বিধবা’। কেউবা কাজের সন্ধানে এলাকার বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকে। পেশা পরিবর্তন করতে থাকে প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও কৃষি শ্রমিক। সমগ্র উপকূলীয় এলাকা লবণমরু ভূমিতে পরিণত হয়। সুন্দরবনের প্রান্ত সীমায় হাজার হাজার বনজীবী বসবাস করে। সুন্দরবন প্রভাবিত উপজেলাগুলোর মধ্যে খুলনার কয়রা উপজেলা একটি উল্লেখ যোগ্য জনপদ। উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ জনগণ সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এ ইউনিয়নগুলোর মধ্যে মহেশ্বরী পুর, কয়রা সদর, উত্তরবেদকাশি, দক্ষিণবেদকাশি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সুন্দরবন নির্ভরশীল জনগণ বসবাস করে। এখানের ৭০% পরিবার সুন্দরবন নির্ভরশীল। পেশায় এরা সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালী, পোনা সংগ্রহকারী। এ সকল পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা যারা সুন্দরবনে যায়, তারা অনেকেই বাঘ ও কুমিরের আক্রমণের শিকার হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। ইনিশিয়েটিভ ফোর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট(ICD) এল এক জরিপে ২০০১ সাল থেকে জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত ২২ বছরে কয়রা উপজেলায় ১৩৩ জন বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। এর মধ্যে আমাদী ইউনিয়নে ২২ জন, বাগলী ইউনিয়নে ১৭, মহারাজপুর ইউনিয়নে ২১ জন, কয়রা সদর ইউনিয়নে ৩৮ জন, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে ৪ জন ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ৩১ জন বাঘের আক্রমে মারা যায়। কারো লাশ পাওয়া যায়, কারো শুধু দেহের সামান্য অংশ। বাঘের আক্রমণে বেঁচে এসে ২ জন পঙ্গু অবস্থায় বেঁচে আছে। ২ জন মাথায় আঘাত নিয়ে কয়েক বছর যুদ্ধের পর এর মোটমোটি সুস্থ। এরই মধ্যে অনেকেই জীবন বাচাঁনোর তাগিদে আবারও সুন্দরবনে ছুটে চলেছে। সমগ্র সুন্দরবন প্রভাবিত এলাকায় এ ধরনের হাজার হাজার পরিবার রয়েছে। নদীতে জাল টেনে চলে মরিয়ম বিবি, মনিরা খাতুন, মোমেনা বেগমসহ অধিকাংশ বাঘ বিধবার সাথে কথা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপন্ন ও নদী ভাঙ্গন কবলিত এক জনপদ উপকূলীয় কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন।দক্ষিণবেদকাশি ইউনিয়ের চারধারে নদী। এই দ্বীপ জনগোষ্ঠীকে সুন্দরবন, নদী এবং লবণাক্ত কৃষি জমির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। আইলা, সিডর দুর্গত ওই ইউনিয়নের জোড়জিং গ্রামের বাঘ বিধবা মোমেনা বেগম তার ছেলে বিল্লাল হোসেন বলেন, প্রথমে বাপ সুন্দরবন করতো তার ২০০১ সালে বাপ মারা যাওযার পর মা নদীতে জাল টেনে সংসার চালাতো মার বয়স হওয়াতে এখন সে নদীতে জাল টানে। তাদের পরিবারের সদস্য ৫ জন। ময়না বেগম বলেন, লবণ পানির চিংড়ি ঘের না হলে আমি বাঘ বিধবা হতাম না। আমার স্বামী দিনমজুরির কাজ করত। স্বামী-সন্তান নিয়ে খেয়ে পরে ভালোই চলছিল। এলাকার কৃষি জমিতে দৈনিক কাজ করতে পারত। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কৃষি জমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে চিংড়ি ঘের বিস্তার লাভ করে। আমার স্বামী কাজ হারাতে থাকে আর কপাল পড়তে শুরু করে আমারও। স্বামী কোনো কাজ না পেয়ে দিনের পর দিন বেকার বসে থাকে। সংসারে অভাব কষ্ট বাড়তে থাকে। কোনো উপায় না পেয়ে সুন্দরবনে মধু কাটতে যায়। একদিন সকালে মধু কাটার সময় সে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। এরপর থেকে নদী জাল টেনে দুই ছেলে নিয়ে কোনো মতে বাপের ভিটেতে বসবাস করছি। নদীতে জাল টেনে চলে চলত আমার জীবন এখন ছেলে জাল টানে। সেলাই মেশিন চালিয়ে বেঁচে আছে বাঘ বিধবা জাহানারা। আইলা দুর্গত মহারাজপুর ইউনিয়নের বডবাড়ি গ্রামের বাঘ বিধবা জাহানারা। পরিবারের সদস্য ৩ জন। জাহানারা বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরির কাজ করত। স্বামী সন্তান নিয়ে খেয়ে পরে ভালোই চলছিল। কিন্তু এলাকার চিংড়ি ঘের বেড়ে যাওয়ায় আমার স্বামীর কাজের অভাব দেখা দেয়। কোনো উপায় না পেয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরা ও মধু কাটতে যায়।এভাবে চলছিলো কয়েক বছরর। ২০০৯ সালে একদিন সকালে মাছ ধরার সময় সে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। ১ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, জোন মজুরি দিয়ে সংসারের খরচ জোগাতে থাকি। আইসিডি সংগঠনের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়ে আমি সেলাই মেশিন চালাই। এভাবে চলছে আমার সংসার জীবন। এলাকার মানুষের বদ্ধমূল ধারণা, অলক্ষ্মী মহিলার জন্যই তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এ ধারণা থেকেই পরিবার থেকে ওইসব বিধবার উপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। অনেকে স্বামী মারা যাওয়ার পর বাবার বাড়ি, নদীর চরে সরকারি খাস জায়গায় ও অন্যের জমিতে বসবাস করছে। স্থায়ী বাসস্থান না থাকার কারণে সেবা প্রদানকারী সংগঠনের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা বঞ্চিত। দীর্ঘক্ষণ লোনা পানিতে থাকার ফলে চর্মরোগ সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত এবং অর্থাভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। অনেক বার উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিয়ে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধের তারিখ রেজুলেশনের মাধ্যমে নির্ধারন হলেও কয়েক দফায় তারিখ পরিবর্তন হয় কিন্তু লবন পানি উত্তোলন বন্ধ হয় না।