নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন


রুদ্রবাংলা প্রকাশের সময় : জুলাই ১০, ২০২৩, ১২:২৫ /
নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে অগ্রগতি-অগ্রযাত্রার বাঁকে বাঁকে নাগরিকদের কল্যাণে অনেক কিছুই দৃশ্যমান হলেও একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও জিইয়ে আছে। ৯ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের যে খবর জানা গেছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি একটি ওয়েবসাইট থেকে লাখ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের খবর জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্র্যাঞ্চ। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের পূর্ণ নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল আইডি এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও। গত ২৭ জুন কাজ করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে এই ফাঁসের তথ্য আবিষ্কার করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান বিট্রেকের গবেষক ভিক্টর মার্কোপোলস। তারপর তিনি দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশের ই-গভর্নর কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে সরকারের কোন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছেÑ এ বিষয়ে কিছু জানায়নি টেকক্র্যাঞ্চ।

নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের যে বিস্ময়কর ঘটনার বার্তা মিলেছে তাতে আমাদের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও ফের সঙ্গতই সামনে এসেছে। আমরা জানি, ইতঃপূর্বে বহুবার দেশের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কিংবা গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি রাষ্ট্রের সঙ্গতই নাগরিকের রয়েছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) নম্বর অনুচ্ছেদে প্রাইভেসি রাইটস বা ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ অপরাধ হিসেবে নানা আন্তর্জাতিক সনদেও উল্লেখ রয়েছে। একজন নাগরিক কিংবা ব্যক্তি কোন তথ্য দেবেন কিংবা ব্যক্তির কাছে কতটা তথ্য চাওয়া যায়, সেই বোধ তৈরি না হওয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা হুমকির মুখে রয়েছে বলে এর আগে সামাজিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অনেকেই অভিমত দিয়েছিলেন। প্রাইভেসি নষ্ট হয় এমন তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, ফোন বা ই-মেইল আইডির নম্বর, রক্তের গ্রুপ, মেডিক্যাল রিপোর্ট ইত্যাদি। গোপনীয়তার প্রতিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হলেও এর ব্যত্যয় ঘটে চলেছে নানা ক্ষেত্রে। আমরা চাই, তথ্যপ্রবাহ অবারিত থাকুক, কিন্তু যে তথ্য প্রকাশ কিংবা ফাঁস নাগরিকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়Ñ এই পথ রুদ্ধ করতে হবে। নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রকে আরও সজাগ হতে হবে। প্রতিটি আইনি সংস্থার দায়িত্বশীলদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হতে হবে।

ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করায় এর সুযোগ নিয়ে অপশক্তি নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেÑ এমন নজিরও আমাদের সামনে আছে। এমন প্রেক্ষাপটে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। কে কতটা তথ্য উন্মুক্ত করবেনÑ এ ব্যাপারে ব্যক্তিকেই সজাগ থাকতে হবে। আমরা দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিশেষ করে অনেক নারী ইতোমধ্যে এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন, যা তাদের সামাজিক-পারিবারিক জীবন ধসিয়ে দিয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব ও আইনি কাঠামোয় সহায়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। সন্দেহ নেই, এর ইতিবাচক প্রভাবও নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং নাগরিকরা নানা ক্ষেত্রে এর সুফলভোগী। যেহেতু প্রযুক্তির বিকাশ ক্রমেই ঘটে চলেছে কিংবা প্রযুক্তির নতুন নতুন দরজা উন্মুক্ত হচ্ছে, এমন বাস্তবতায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করাসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি সংস্থার সেবা যাতে নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পান তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা জানি, তথ্যের অবাধপ্রবাহ এবং নাগরিকদের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের অনেকেই এ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না, এই বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। এমতাবস্তায় জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি।

স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সব ক্ষমতার মালিক দেশের জনগণ। তাই সরকারের কাছে যে তথ্য আছে তা শুধু সরকারের একার বিষয় নয়, জনগণেরও তা জানার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কিছু বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। তথ্যের স্বাধীনতা ও অভিগম্যতাও একটি মৌলিক মানবাধিকার, জাতিসংঘের সনদেও তা উল্লেখ রয়েছে। নাগরিকের তথ্যের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা রাষ্ট্রশক্তির আমলে রাখা বাঞ্ছনীয়।